যত সর্বনাশ দলীয় প্রতীকেই!

যত সর্বনাশ দলীয় প্রতীকেই!

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ঘিরে সংঘাত-সহিংসতা বাড়ছেই। রক্তাক্ত ভোটযুদ্ধে প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। প্রথম দুই ধাপে ভোট গ্রহণের আগে-পরে ব্যাপক সহিংসতায় প্রায় অর্ধশত মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আড়াই হাজারের বেশি। পরবর্তী ধাপের নির্বাচন ঘিরেও আশঙ্কা বিরাজ করছে।

এমন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠামিশ্রিত পরিস্থিতির মধ্যে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতো রাজনীতিবিদরাও বলছেন, এবারের ইউপি নির্বাচন ঘিরে এমন রক্তক্ষয়ী সহিংসতার প্রধান কারণ হচ্ছে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠান। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কারণেই তৃণমূল পর্যায়ে সহিংসতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তাই দলীয় প্রতীক ছাড়াই স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার দাবি জোরালো হয়ে উঠছে।

প্রথম ধাপে গত ২১ জুন ২০৪টি এবং ২০ সেপ্টেম্বর করোনার কারণে স্থগিত আরও ১৬০ ইউপির নির্বাচন হয়। ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় ধাপের ৮৩৫টি ইউনিয়নের নির্বাচন। আগামী ২৮ নভেম্বর তৃতীয় ধাপে এক হাজার সাতটি ইউপির পাশাপাশি ১০টি পৌরসভায় নির্বাচন হবে। ২৩ ডিসেম্বর চতুর্থ ধাপে ভোট হবে ৮৪০ ইউপিতে।

এই ইউপি নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে সংঘাত-সংঘর্ষ, হামলা-পাল্টা হামলা, গুলি, ককটেল বিস্ম্ফোরণ ও ভোটকেন্দ্র দখলের ঘটনা নিকট অতীতের রেকর্ড ভেঙেছে। প্রথম দুই ধাপের ইউপি নির্বাচনের আগে-পরে মিলিয়ে ৪৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। দ্বিতীয় ধাপে ১১ নভেম্বর ভোট গ্রহণের দিনই মারা গেছেন সাতজন। এই ধাপে নির্বাচনের আগে ও পরের ঘটনায় নিহত হন আরও ৩১ জন। প্রথম ধাপের নির্বাচনের প্রচার থেকে নির্বাচন পর্যন্ত নিহত হন পাঁচজন। আরও তিনজন বিভিন্ন সময় নিহত হয়েছেন।

নির্বাচনী সহিংসতার বড় উদাহরণ হচ্ছে, দ্বিতীয় ধাপের ভোট গ্রহণের পরদিন ১২ নভেম্বর গাইবান্ধা সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত ইউপি সদস্য আব্দুর রউফ মাস্টারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা। ১৫ অক্টোবর মাগুরা সদর উপজেলার জগদল ইউনিয়নে দুই সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের বিরোধের জেরে দুই ভাইসহ চারজন এবং ৮ নভেম্বর মেহেরপুরের গাংনীতে আরও দুই ভাই নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, শুধু ইউপি নির্বাচনই নয়, স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচনেও খুনোখুনি ও সহিংসতার ঘটনা কম নয়। জানুয়ারি থেকে গত ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচন ঘিরে ৪৬৯টি সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৮৫ জন। আহত হয়েছেন ছয় হাজারের বেশি মানুষ। ১০ নভেম্বরের পর আরও ১১ জন নিহত হয়েছেন। সবমিলিয়ে শুধু চলতি বছরই নির্বাচনী সহিংসতায় ৯৬ জনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। এই সহিংসতার বেশিরভাগ ঘটেছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে। হতাহতদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দলীয় মনোনয়নবঞ্চনা, আধিপত্য বিস্তার, অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা ইত্যাদি কারণে সহিংসতার ঘটনাগুলো ঘটছে।

একটা সময় ইউপি নির্বাচন মানে ছিল গ্রামবাংলায় ভোটের উৎসব। তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের মানুষ একে অপরের সঙ্গে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি বজায় রেখে এই উৎসবে অংশ নিতেন। কিন্তু দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন ব্যবস্থা চালুর পর সেই সম্প্রীতি ও সদ্ভাব কমেছে অনেকটাই। তার বদলে তৈরি হচ্ছে দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় পরিবেশ।

ইউপি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার হার বেড়েছে লক্ষ্যণীয়ভাবে। কোথাও কোথাও এই বিদ্রোহের সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থিতার আড়ালে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলের নেতাকর্মীরাও ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন। আবার সরকারি দলের প্রার্থীদের ‘হুমকি-ধমকিতে’ অন্যরা ভোটের মাঠ থেকে সরে যাওয়ায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার হারও বাড়ছে।

নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৪০ শতাংশ এবং প্রথম ধাপের নির্বাচনে ২৪ শতাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় ধাপের ৮৩৫টি ইউপির মধ্যে ৩৩০ স্বতন্ত্র প্রার্থী জিতেছেন, যাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। ৪৮৬টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। যার মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ৮১ জন। ২১ জুনের ভোটে ২০৪টি ইউপির মধ্যে ৪৯ এবং ২০ সেপ্টেম্বরের ভোটে ১৬০ ইউপির মধ্যে ৩৬ স্বতন্ত্র প্রার্থী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের হয়ে ২১ জুনের ভোটে ১৪৮ এবং ২০ সেপ্টেম্বর ১১৯ জন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। যাদের মধ্যে ৭১ জনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছেন। এ দুই ধাপে এক হাজার ১৯৮টি ইউপিতে মেম্বার পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ২৫২ জন।

দেশব্যাপী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে এভাবে নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কয়েকজন নেতা বলেছেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় ভোটের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। সংঘাত-সহিংসতার পাশাপাশি অধিকাংশ ইউপিতেই আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার ঝোঁক বেড়েছে। আবার মনোনয়নবাণিজ্য এবং মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের অযাচিত ‘হস্তক্ষেপের’ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এমনকি বিএনপি-জামায়াতসহ অন্য দলের অনুপ্রবেশকারী ও বিতর্কিতরাও দলীয় মনোনয়ন বাগিয়ে নিতে পারছেন। এ পরিস্থিতিতে তৃণমূলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে অনেক এমপি ইউপি নির্বাচনের প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের কাছে চিঠি লিখেছেন। স্থানীয় এমপিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জের ৮৮টি ইউপির চেয়ারম্যান পদের প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

ইউপি নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আগের মতো নির্দলীয় নির্বাচনের পক্ষে কথা বলেছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হলে ইউপি নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত ভালো প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন। প্রশাসনও সব প্রার্থীর দিকে সমান নজর রাখবে। কিন্তু এখন যে প্রার্থী সরকারি দলের প্রতীক পান, তার প্রতি প্রশাসনেরও সুনজর থাকে। এর ফলে ওই প্রার্থী অপেক্ষাকৃত বেশি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। যার ফলে সংঘাত-সহিংসতা বৃদ্ধি পায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেছেন, এক সময় সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বনিম্ন স্তর ইউপি নির্বাচন ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষপাতের বাইরে। এখন দলভিত্তিক নির্বাচনের কারণে সংঘাত-সহিংসতা আগের চেয়ে বেড়েছে। যে কোনো উপায়ে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন নিতে অসৎ প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক অবক্ষয়ও ঘটছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ফায়দা হাসিলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছেন। আবার সরকারি দলের প্রতীকবঞ্চিত নেতারাও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে পেশিশক্তি দেখান, যার অনিবার্য ফল সহিংসতা।

ইউপি নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক সহিংসতায় উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তৃণমূল পর্যায়ের এই নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট উৎসবমুখর পরিবেশ ধরে রাখতে এবং পরবর্তী ধাপের নির্বাচনে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ ধরে রাখতে নির্বাচন কমিশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম লীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ সমকালকে বলেছেন, দলের মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকেও ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক রাখা হবে কি হবে না- সেটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নেতাদের বক্তব্য শুনলেও এ বিষয়ে কোনো মতামত দেননি। নিশ্চয়ই গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধান দেবেন প্রধানমন্ত্রী।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি দলীয়ভাবে ইউপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তবে আওয়ামী লীগ নিজেরা নিজেরাই মারামারি ও খুনোখুনি করছে। বিএনপি আগে থেকেই দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচনের বিপক্ষে ছিল। কিন্তু সরকার সে কথা আমলে না নেওয়ায় নির্বাচনকে ঘিরে আজকের পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, বিএনপি ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বিরোধী আগেও ছিল, এখনও সমর্থন করে না। কেননা, এর মধ্য দিয়ে জনগণকে বিভাজন করা হয়েছে। এ কারণে সন্ত্রাস হচ্ছে। আগে মানুষ যাদের পছন্দ করত, তাদের ভোট দিত। এখন আওয়ামী লীগ টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দিচ্ছে। ফলে সমাজের জনপ্রিয় ব্যক্তিরা নির্বাচনে যাচ্ছেন না। সন্ত্রাসীরা ভোট করায় সন্ত্রাস হচ্ছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম অবশ্য দলীয় প্রতীকে ভোট গ্রহণ হওয়ার কারণেই ইউপি নির্বাচনে সংঘাত বাড়ছে- এমন বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হননি। তিনি বলেন, এটা আসলে শাসকশ্রেণি ও শাসক দল বিনাভোটে নির্বাচন করার যে রেওয়াজ চালু করেছে, তারই স্বাভাবিক পরিণতি। এমপিরা যদি বিনাভোটে নির্বাচিত হন, তাহলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শাসকশ্রেণির প্রার্থীরাও মনে করতে পারেন তাদের কেন ভোটে নির্বাচিত হতে হবে? এর সঙ্গে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়া না-হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, বর্তমান সরকার নিজেই তো ভোটারবিহীন নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছে। এ জন্য তারা সংসদ থেকে একেবারে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পর্যন্ত সিলেকশনের নির্বাচন করতে চাচ্ছে। দলীয় প্রতীক এখন ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে ‘লোভের প্রতীক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এই প্রতীক পেলে যেভাবেই হোক জয়লাভ করা যাবে। এ কারণেই ইউপিসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এত হানাহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

(দৈনিক সমকাল)

Please Share This Post in Your Social Media




প্রধান কার্যালয়ঃ স্কুল মার্কেট,২য় তলা, কচুয়া বাজার,সখীপুর, টাঙ্গাইল। মোবাইলঃ 01518301289; 01708067997 ইমেইলঃ Kachuaonlinenews@gmail.com ©TangailNews24 Is A Part Of KachuaOnlineNews© © All rights reserved © 2021 Tangail News
Design BY NewsTheme