বিশ্বনবীর অপমান সইবে না মুসলমান ……বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

কী লিখি, পীর হাবিব আমার খুবই প্রিয়। যা সত্য বলে মনে করে, তা-ই কলমের ডগায় তুলে ধরে। সেই পীর হাবিবের বাড়িতে আক্রমণ, হামলা- এর নিন্দার ভাষা নেই। সরকারকে বলব, বিষয়গুলোকে বেশি বাড়তে দেবেন না। কারও লেখা পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু কলম জাপটে ধরা ভালো নয়। কলম সৈনিকদের সম্মান দিন, নিরাপত্তা দিন।



রসুলে করিম (সা.)-এর মাধ্যমে শান্তির ধর্ম ইসলাম প্রবর্তনের পর থেকেই প্রিয় নবী (সা.) ও ইসলামের ওপর বারবার আঘাত এসেছে। সর্বশেষ রসুল (সা.)-কে নিয়ে ফ্রান্সের এক অমানুষের চরম ব্যঙ্গ। মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে লয়-তাল রেখে তীব্র নিন্দায় বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। গত শনিবার টাঙ্গাইল ইমাম সমিতির আহ্বানে এক প্রতিবাদ মিছিল ছিল। আত্মিক তাগিদেই সে মিছিলে শরিক হয়েছিলাম। প্রায় ৩-সাড়ে ৩ কিলোমিটার চলেছি। মিছিল শেষে শহীদ মিনারে প্রায় এক ঘণ্টা তীব্র রোদে দাঁড়িয়ে ছিলাম।



মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন কোনো দিন ছিল না, ২৪ ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার হাঁটিনি। পাকিস্তানি হানাদাররা আমার সঙ্গে হেঁটে পারেনি বলে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে।কিন্তু ৩-সাড়ে ৩ কিলোমিটার মিছিলের সঙ্গে চলে উপলব্ধি করেছি, আগের সেই সামর্থ্য নেই। মনে হয় ছয়-সাত বছর পর টাঙ্গাইল জামে মসজিদের সামনে গিয়েছিলাম। রসুলে করিম (সা.)-এর অবমাননায় এমনিতেই বুক ভারী ছিল। তার ওপর বাদশাহি আমলের মসজিদ ধসিয়ে বিশাল কমপ্লেক্স করায় ভীষণ ব্যথিত হয়েছি। আগে ভাঙা মসজিদ জুমা ঘরে আল্লাহ ছিল, ইবাদত-বন্দেগি ছিল।

কিন্তু এখন অনেক মসজিদই ঝকঝকে তকতকে মারবেল পাথরে মোড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু দরজায় তালা। সব সময় মসজিদে মানুষের আশ্রয় নেই। আল্লাহর ঘর চোরের হাত থেকে রক্ষা করতে মস্তবড় তালা! আতিয়া মসজিদ হয়েছিল বাদশাহ শাহজাহানের আমলে।তারপর টাঙ্গাইল জামে মসজিদ। চার-সাড়ে চার শ বছরের সেই মসজিদের লেশমাত্র নেই। যখন ভাঙা হবে বা কমপ্লেক্স করা হবে তখন পূর্তমন্ত্রী, জেলা প্রশাসক ও অন্যদের চিঠি দিয়েছিলাম পুরনো স্মৃতি ধরে রাখতে। বাদশাহি আমলের মূল মসজিদ রেখে সহজেই কমপ্লেক্স করা যেত।



কিন্তু এখন মূল উদ্দেশ্য আল্লাহ-রসুল নয়, ধর্মকর্ম নয়- মূল উদ্দেশ্য মসজিদের নামে ব্যবসা। টাঙ্গাইল মসজিদও তার ব্যতিক্রম নয়। ১০-১২ তলা মসজিদ কমপ্লেক্স দুই-তিন তলায় নামাজ-কালাম, বাকি সবটাই হাটবাজার। বই-পুস্তকে পড়েছি, মসজিদ আল্লাহর ঘর, হাটবাজার শয়তানের বাসা। এখন মসজিদের চাইতে ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাটই আসল। টাঙ্গাইল মসজিদ কমপ্লেক্সেও শত শত দোকান ভাড়া বা লিজ দেওয়া হয়েছে।কয়েক লাখ স্কয়ার ফুটের ১০-১৫-২০ হাজার স্কয়ার ফুট মসজিদের জায়গা বা নামাজ-কালাম পড়ার জন্য, বাকি সবই জাগতিক কর্মকান্ডে ব্যবহার।

টাঙ্গাইল পুরনো ফৌজদারির পাশেও ঠিক তেমনি একটি মসজিদ ভেঙে আধুনিক করা হয়েছে। আতিয়া থেকে যখন টাঙ্গাইল মহকুমা শহর স্থানান্তরিত হয় তখন পার্কের পুকুরের পাশে মসজিদটি করা হয়েছিল। সেখানেও মসজিদের পশ্চিম পাশ দিয়ে দোকান করা হয়েছে। কাবাকে উদ্দেশ করে সালাম দেওয়ারও জায়গা নেই, সিজদা দেওয়ারও জায়গা নেই। এ মসজিদের জন্যও সদরের এমপিকে বলেছিলাম, জেলা প্রশাসককে বলেছিলাম। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।



কারণ এখন মানুষের নয়, শয়তানের জোর বেশি।একজন মুসলমান হিসেবে একজন মানুষ হিসেবে আত্মিক তাগিদে বিশ্বনবী আহমদ মোস্তফা মোহাম্মদ মোস্তফার অবমাননার প্রতিবাদে আপনাদের সঙ্গে যুক্ত হতে এসেছি। এখানে বক্তৃতা করতে আসিনি। সারা জীবন বক্তৃতা করেছি। তবে ইমাম-মাশায়েখদের বলছি, মাওলানা-মাশায়েখদের সব আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে শুধু সাধারণ মানুষের কাছে না যাওয়ার কারণে। কিছু মসজিদ মাদ্রাসা এতিমখানার লোক নিয়ে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহ আকবার’ সেøাগান দিয়ে দায় সারার চেষ্টা করবেন না। এভাবে চলবে না, জনগণকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে কত বড় গণজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তাদের ১৩ দফার সঙ্গে সাধারণ মানুষ সম্পৃক্ত ছিল না। তাই সে আন্দোলন মাঠে মারা গেছে।



হেফাজতের ১৩ দফা নয়, মানুষ ছিল এক দফায় সম্পৃক্ত- ইসলাম এবং রসুল (সা.)-এর অবমাননার প্রতিবাদ-প্রতিরোধে।তবে যাই হোক, ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ে এমন ছেলেখেলা চলতে পারে না। সত্যিই এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত। ফ্রান্সের পণ্য বর্জন অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ। সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, অনতিবিলম্বে ফ্রান্সের এসব কর্মকান্ডের নিন্দা করুন। ফ্রান্স ক্ষমাপ্রার্থনা না করলে প্রয়োজনে ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।



গতকাল টাঙ্গাইলে কওমি মাদ্রাসার পক্ষ থেকে এক চমৎকার বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। ব্যাপারটি নিয়ে ছেলেখেলা করবেন না। ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে।লিখতে চেয়েছিলাম হাজী মো. সেলিমকে নিয়ে। সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিম এই তো সেদিন বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে এসেছিলেন।

তার সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, জমি দখল, অত্যাচার, নির্যাতন সবার জানা। মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের মতো একজন নিবেদিত আওয়ামী লীগারকে বঞ্চিত করে কেন কীভাবে হাজী মো. সেলিমকে মনোনয়ন দেওয়া হলো? হাজী মো. সেলিম কি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন? মোটেই না।সরকারি মদদে সন্ত্রাসী দিয়ে ভোট ডাকাতি করে মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে পরাজিত করেছেন- এ কি সরকার জানত না? সরকারের গোয়েন্দারা কি জানত না? অবশ্যই জানত। পাপে ছাড়ে না বাপেরে।



তাকে আল্লাহ ধরেছেন। আল্লাহর মাইর দুনিয়ার বাইর। আল্লাহ ধরলে এমনই হয়। আমরা কত কিছু করলাম। কিছুই না হোক বাংলাদেশের সৃষ্টির বেদনায় সামান্য হলেও জড়িয়ে ছিলাম। আমরা ২-৪-৫-১০ কোটি টাকার কথা ভাবতে পারি না এদের হাজার হাজার কোটি! ব্যাংকের জমি, রেলের জমি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি, সাধারণ মানুষের জমি দখলের কোনো প্রতিকার নেই। হাজী সেলিম এবং তার ছেলে বহিষ্কৃত সিটি কাউন্সিলর ইরফান সেলিমের কত টাকা দরকার? কী হবে এত টাকা দিয়ে সম্মান আর শান্তিই যদি না থাকে।ছোটবেলায় শুনতাম মুরব্বিরা বলতেন, ‘বেশি বাড়িও না ঝড়েতে ভাঙবে মাথা, বেশি ছোট হইও না ছাগলে খাবে পাতা।’ কথাগুলো যে কতটা নির্মম সত্য এখন প্রতিনিয়তই দেখতে পাচ্ছি। দুর্নীতিবাজ যত বড়ই হোক একদিন না একদিন তাকে ধরা পড়তেই হবে।



কী হলো ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে শত শত বিঘা জমি দখল করে? কী হলো কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাট চুরি-চামারি করে? জনাব হাজী সেলিম জীবিত থাকতেই কথা বলতে পারেন না। সম্রাট শাহজাহানের মতো গৃহবন্দী। ইরফান সেলিমের দাপটে সবাই দিশাহারা।



নৌবাহিনীর এক লেফটেন্যান্টকে নাজেহাল এবং নির্মম নির্যাতন করার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তার সাঙ্গোপাঙ্গরা এখন সব দোষ নিজেদের ঘাড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তা করলে কী হবে? পাপ কখনো চাপা থাকে না। ঘরে শান্তি না থাকলে কার জন্য এসব লুটপাট? কার জন্য চুরি-চামারি? এসবের কিছুই কেউ কবরে নিয়ে যেতে পারবে না। খালি হাতেই যেতে হবে। তাই বলছি, সময় থাকতে সাবধান! কোনো লাভ নেই। শাহেদ-সাবরিনা করোনায় জালিয়াতি করে নিজেদের জীবন খুব একটা সুখময় করতে পারেননি। অর্থবিত্ত দিয়ে সাময়িক প্রতিপত্তি দেখানো যেতে পারে; কিন্তু কিছুই হয় না। নকলের ওপর শক্ত ইমারত গড়া যায় না- সে যেই করুন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষয়ক্ষতি গায়ে লাগে। আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে অনেক আশা নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট করেছিলেন।



কত সম্পত্তি দিয়েছিলেন তার লেখাজোখা নেই। এখন যার বাজারমূল্য কয়েক লাখ কোটি টাকার ওপরে। আসল আর বাড়েনি। বরং সবই লুটেপুটে খেয়েছে, এখনো খাচ্ছে।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে সব মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মানি ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। তারপর খেতাবপ্রাপ্তদের জন্যও সম্মানির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কয়েক বছর মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত এবং খেতাবপ্রাপ্ত তিন পদেরই ভাতা পেয়েছি। মাঝখানে এক রাজাকার সন্তান হুট করে এক চিঠি দিলেন- মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত এবং খেতাবপ্রাপ্ত এ তিন পদের যেটায় সর্বোচ্চ ভাতা একজন মুক্তিযোদ্ধা শুধু সেই একটাই পাবেন। কী দুর্ভাগ্য!



আমি খেতাবপ্রাপ্ত, যুদ্ধাহত, মুক্তিযোদ্ধা। সরকারি সম্মান খেতাবপ্রাপ্ত বীরউত্তমের ভাতা পাই না। যেহেতু যুদ্ধাহতের ভাতার পরিমাণ বেশি সেহেতু শুধু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পাই। সারা জীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। এই শেষ বয়সে এসে অনেকটাই বিরক্ত লাগে। কারণ কোনো প্রতিকার নেই।যেহেতু রাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দেয় সেহেতু আমি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়ার যোগ্য। আল্লাহর মেহেরবানিতে যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে সর্বোচ্চ সাহসিকতা পদক বীরউত্তম খেতাব পেয়েছি। রাষ্ট্র খেতাবপ্রাপ্তদের সম্মানি দিচ্ছে বা দেয় সেটা অবশ্যই আমার প্রাপ্য।

যুদ্ধ করতে করতে আহত হয়েছিলাম। রাষ্ট্রে যুদ্ধে আহত ভাতার বিধান আছে। সে ভাতা আমার পাওয়ার কথা। মুক্তিযোদ্ধা এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার চাইতে যেহেতু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বেশি সেহেতু আমি শুধু যুদ্ধাহতের ভাতা পাই।



রাষ্ট্র আমাকে খেতাবপ্রাপ্তের ভাতা এবং একজন মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বরাদ্দ করলেও রাজাকার পুত্রের এক কলমের খোঁচায় আমার মতো কতজন যে এ ভাতা থেকে বঞ্চিত তা শুধু আল্লাহই জানেন। জানি না কোথায় এর প্রতিকার পাব।

(বিডি প্রতিদিন)

error: Content is protected !!