চাকরির কথা বলে প্রতারণা! মা-ছেলের পরিকল্পনায় বাবাকে খুন!

মা ও ছেলের পরিকল্পনায় রাজধানীর হাজারীবাগে বাবাকে খুন করা হয়। মা শিল্পী বেগমের নির্দেশে কলেজ পড়ুয়া ছেলে সিজন মাহমুদ ৬টি ঘুমের ওষুধ কিনে আনেন। শিল্পী বেগম ঘুমের ওষুধ সরবতের সঙ্গে মিশিয়ে তার স্বামী সোহেলকে খেতে দেন। সরবত পান করার পর সোহেল ঘুমিয়ে পড়েন। এরপর শিল্পী বেগম তার ছেলেকে ফোন করে বাসায় ডেকে আনেন। সিজন তার বন্ধু ফাহিমকে নিয়ে তাদের ভাড়া বাসায় চলে আসেন। সিজন তার মাকে ব্যাগ গুছিয়ে বাসা থেকে চলে যেতে বলেন। মা চলে যাওয়ার পর সিজন তার বন্ধুকে নিয়ে হত্যা মিশনে নেমে পড়েন।



আগে থেকে কিনে আনা গিয়ার চাকুর অর্ধেক অংশ জুড়ে কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে ফেলেন। ফাহিম বালিশ দিয়ে ঘুমন্ত সোহেলের মুখ চেপে ধরেন। আর সিজন গিয়ার চাকু গলার মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। মিনিট খানেকের মধ্যে হত্যার কাজ শেষে করে সিজন ও ফাহিম দরজায় তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যান। ৩ দিন পর ওই বাসা থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে, পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙ্গে লাশ উদ্ধার করে।
মা ও ছেলের পরিকল্পনায় বাবা খুনের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর হাজারীবাগের মধ্য বছিলার ৬৫/১ নম্বর বাড়ির নিচতলায়। লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশ ওই বাসা থেকে সোহেলের একটি জাতীয় পরিচয় পত্র উদ্ধার করে। পুলিশ তদন্ত করে দেখে যে এনআইডিটি জাল। পরে লাশের ফিঙ্গার প্রিন্ট থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভার থেকে তার নাম পরিচয় নিশ্চিত হয়। এনআইডিতে তার নাম মো. সোহেল। পিতার নাম মমতাজ উদ্দিন হাওলাদার। মায়ের নাম বক্ষুল বেগম। স্ত্রীর নাম হেলেন আক্তার। বর্তমান ঠিকানা নারায়ণগঞ্জ সদর কাশিপুর। তবে হত্যার ঘটনার কয়েকদিন পর পুলিশ আদাবরের নবোদয় হাউজিংয়ের একটি বাসা থেকে শিল্পী বেগমকে গ্রেফতার করে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাগেরহাট থেকে তার ছেলে সিজন মাহমুদ ও সাভার থেকে ছেলের বন্ধু ফাহিমকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত তিনজনই হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।



পুলিশের ধানমন্ডি জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আব্দুল্লাহ হিল কাফী বলেন, জবানবন্দিতে শিল্পী বেগম জানিয়েছেন সোহেল তার তৃতীয় স্বামী। আর সিজন মাহমুদ তার দ্বিতীয় স্বামী সেকেন্দার শেখ সাগরের সন্তান। বছর সাতেক আগে একটি ঘটনায় তার স্বামী সেকেন্দার গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দী হন। ওই ঘটনায় তার স্বামীকে জামিন করার জন্য সোহেলের সহযোগিতা নেন। সেখান থেকে সোহেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সোহেল তখন রায়েরবাজারে সবজির দোকানদার বলে পরিচয় দেয়। ৫ বছর আগে দ্বিতীয় স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে সোহেলকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় সিজন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছিল। তার দ্বিতীয় স্বামী বাগেরহাটে চলে যান। বছিলা এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে তৃতীয় স্বামী সোহেল ও ছেলে সিজনকে নিয়ে থাকতেন। বিয়ের পর বুঝতে পারেন যে তার স্বামী একজন প্রতারক। মানুষের কাছে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য বলে পরিচয় দিতেন। এই পরিচয় দিয়ে তিনি বিভিন্ন মানুষকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ২০ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা নিতেন। এভাবে প্রতারণা করে ৬/৭ মাস পরপর বাসা পরিবর্তন করে থাকতেন তারা। এ বছরের জানুয়ারি মাসে ছেলে সিজনের চাকরি দিবেন বলে সোহেল তাকে জানায়। এ জন্য তিনি বাগেরহাটে তার দ্বিতীয় স্বামীর কাছ থেকে ১ লাখ টাকা নিয়ে আসেন। ওই টাকা সোহেলের হাতে তুলে দেন ছেলের চাকরির জন্য। এরই মধ্যে তিনি জানতে পারেন যে সোহেলের এর আগে ৩টি বিয়ে ছিল। দুই মাস আগে তার দূর সম্পর্কে খালাতো বোনকে সোহেল বিয়ে করে। এটার প্রতিবাদ করলে সোহেল তার ছেলের সামনে মারধর করে। এরপর থেকে তিনি তার ছেলের চাকরি জন্য দেওয়া ১ লাখ টাকা ফেরত চান। এটা নিয়ে সোহেল প্রায়ই মারধর করতেন।



আদালতে দেওয়া সিজন মাহমুদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, গত আগস্ট মাসে সোহেল মধ্য বছিলার ৬৫/১ নম্বর বাড়ির নিচতলায় একটি কক্ষ ৫ হাজার টাকায় ভাড়া নেন। ওই বাসায় ওঠার পর তার মা বাবার কাছ থেকে ১ লাখ টাকা ফেরত চান। এ নিয়ে প্রায়ই তার বাবা সোহেল মায়ের ওপর নির্যাতন চালাতেন। এ নিয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর মা ও ছেলে মিলে বাবাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সিজন মিরপুরের ফুটপাতের একটি দোকান থেকে গিয়ারওয়ালা চাকু কিনে। পাড়ার একটি ওষুধের দোকান থেকে ৬টি ঘুমের ওষুধ কিনে মাকে দেন। ১৩ সেপ্টেম্বর বিকালে তার মা ঘুমের ওষুধ সরবতের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে বাবাকে খেতে দেন। ওই সময় সিজন তার বন্ধু ফাহিমকে নিয়ে বাইরে অবস্থান করছিলেন। বাবা ঘুমিয়ে পড়ার খবর পেয়ে ওই বাসায় তারা যায়। সিজন তার মাকে বাসা থেকে তার খালার বাসায় পাঠিয়ে দেন। এরপর সিজন ও ফাহিম মিলে সোহেলকে হত্যা করে পালিয়ে যান।



পুলিশের ধানমন্ডি জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আব্দুল্লাহ হিল কাফী আরো বলেন, সোহেল সম্পর্কে তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, তিনি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে লোকজনকে চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা হাতিয়ে নিতেন।
ইত্তেফাক/ইউবি

error: Content is protected !!