রাজনৈতিক প্রভাবে বেপরোয়া তরুণরা

রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে একশ্রেণির তরুণ ও যুবক। এই প্রভাবের কারণেই ‘বীরদর্পে’ নানা ধরনের অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। ধর্ষণ থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, দখল, চাঁদাবাজি কিছুই বাদ যাচ্ছে না। জনপ্রতিনিধি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় এ ধরনের অপরাধ করলেও তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে পদে পদে বাধা আসে। সম্প্রতি সিলেট ও নোয়াখালীতে কিছু বখাটে তরুণ-যুবক নারী নির্যাতন করে সারা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ’ কমিটি করার কথা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে সেটা নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সেবন ও বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু কেউ তাদের কিছু বলছে না। এমন অভিযোগও রয়েছে, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই সীমান্ত দিয়ে বস্তা বস্তা মাদক আসছে। একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতারাও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। এজন্য এলাকা ভাগ করা আছে। কেউ যুবলীগ, কেউ ছাত্রলীগ, কেউ এমপির লোক, কেউবা উপজেলা চেয়ারম্যানের কিংবা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের লোক—এভাবে চলছে রমরমা মাদক ব্যবসা।
মাদকের এই ব্যবসা শুধু এই সরকারের আমলে নয়, বিগত সরকারের আমলেও একই কায়দায় হয়েছে। সেই সময়ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। খোদ রাজধানীতে গড়ে উঠেছে মাদক বেচাকেনার অসংখ্য স্পট। এসব স্পটের কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানেন। জেনেও তারা চুপ থাকেন। কখনো কখনো অবশ্য এসব স্পটে লোক-দেখানো অভিযান চালানো হয়। এমনকি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও জানে কারা মাদক ব্যবসা করছেন, মাদক সেবন করছেন। কিন্তু এক শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়মিত মাসোহারা নিয়ে আর অভিযান চালায় না। আর অবাধে মাদক সেবনের কুফল হচ্ছে ধর্ষণের মতো নিষ্ঠুর ও নির্মম ঘটনা।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৬ হাজার পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখনো আছে ৩০ হাজার। তবে একটা বন্ধ করলে আরেকটি পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট চালু হচ্ছে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন হাইকোর্টের বিচারপতি থাকাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু বেশির ভাগ জায়গায় কমিটি গঠন করা হয়নি।
এদিকে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় দেলোয়াররা আওয়ামী লীগের সবখানে ঠাঁই করে নিয়েছে। সারা দেশের মহানগর, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড—সব শাখায় গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছে দেলোয়াররা। জীবনে কখনো ছাত্রলীগের রাজনীতি কিংবা জয়বাংলা স্লোগান না দিলেও আওয়ামী লীগের কিছু কেন্দ্রীয় নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে সখ্য গড়ে তুলে বনে গেছেন তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। কেউ কেউ গত ১১ বছরে বিশেষ আশীর্বাদে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে কিংবা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে। টেন্ডার থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসাও বাগিয়ে নিয়েছেন তারা।
নোয়াখালীতে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনকারী দেলোয়ারের উত্থান হলো কীভাবে? বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার গ্রামে গ্রামে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে এই ধরনের অসংখ্য দেলোয়ারের উত্থান। তারা মাদক সেবন ও ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম করে যাচ্ছে। মুখে কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। কারণ, ঐ সব দেলোয়ারদের গডফাদার হলেন স্থানীয় একশ্রেণির নেতা।
এই দেলোয়ার এক সময় ছিলেন সিএনজি অটোরিকশাচালক। যোগ দেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে। বনে যান দলের নেতা। তার পরই মাদক বিক্রেতা, সেখান থেকে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বাহিনীর প্রধান। দলের নাম ভাঙিয়ে গড়ে তুলেন অস্ত্র ও মাদকের রমরমা ব্যবসা।
জানা যায়, বেগমগঞ্জের সীমান্তবর্তী পূর্ব এখলাশপুর গ্রামে গড়ে উঠেছে কয়েকটি কিশোর গ্যাং। খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা এই বাহিনীগুলোর রুটিন কাজ। এরকম একটি গ্রুপের প্রধান হচ্ছে দেলোয়ার। জানা যায়, পুরো এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল দেলোয়ার বাহিনী। কেউ কোনো প্রতিবাদ করলে গুলি ও বাড়িঘরে হামলা করা হয়।
ভুক্তভোগী কয়েক জন জানান, ‘ছোট ছোট ছেলে অস্ত্র নিয়ে এসে টাকা দাবি করে। কিছু বললে কিংবা বাধা দিলে গুলি করে। এমনকি বাড়িতে গিয়ে আক্রমণ করে।’
স্থানীয়রা বলছেন, ‘অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ায় আরো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে দেলোয়ার।’ তবে ক্ষমতাসীন দলের কোনো পদপদবিতে নেই বলে জানান এখলাশপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম। তিনি বলেন, ‘পাশের ইউনিয়নের সন্ত্রাসীদের ক্ষমতা দেখিয়ে দেলোয়ার এখলাশপুরে সন্ত্রাসী রাজত্ব কায়েম করছে। সে আমাদের দলের কেউ না।’
সারাদেশে গ্রামে পাড়া মহল্লা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে আওয়ামী লীগের একাধিক গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছে। এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদের পৃথক গ্রুপ আছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদেরও পৃথক গ্রুপ রয়েছে।
একজন পুলিশ সুপার (এসপি) বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে যখনই ব্যবস্থা নিতে যাই, জনপ্রতিনিধিরা ফোন করে বলেন, আপনার এত মাথাব্যথা কেন? জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা না মানলে নানাভাবে হেনস্তা হতে হয়।
দুই জন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, এই ধরনের পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য সঠিক নয়। তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। সরকার পরিবর্তন হবে। এটাই নিয়ম। পুলিশের পবিত্র দায়িত্ব হলো আইনের সঠিক প্রয়োগ। কে কার লোক এটা তার দেখার কথা নয়। অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য। জনপ্রতিনিধিদের কথায় যদি পুলিশ পরিচালিত হয়, সেই পুলিশের প্রয়োজন নেই।
ইত্তেফাক/জেডএইচ

error: Content is protected !!