টাঙ্গাইলে বাসন্তীর একমাত্র কলাবাগানটি ধ্বংস করল বন বিভাগ

টাঙ্গাইলের মধুপুরে কয়েক দিন ধরেই জমি উদ্ধারের নামে স্থানীয় গারোদের মাঠের ফসল ট্রাক্টর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযান চালাচ্ছে বন বিভাগ। উপজেলার আরণখোলা ইউনিয়নের আমতলী গ্রামে এরই মধ্যে ১০ গারো পরিবারের পাঁচ একর জমির আনারস, পেঁপে, আদা, হলুদ, কলা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

সোমবার শোলাকুড়ি ইউনিয়নের পেগামারীতে দরিদ্র বাসন্তী রেমার জীবিকার একমাত্র অবলম্বন কলাবাগানটিও কেটে উজাড় করে দিয়েছে বন বিভাগ। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ গারো সম্প্রদায়ের লোকজন বন বিভাগের রেঞ্জ অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।

স্থানীয় গারোদের অভিযোগ- বন বিভাগের জমি দাবি করে কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই গত ২৪ আগস্ট পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে ট্রাক্টর দিয়ে তাদের জমির ফসল মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। ওই সময় তাদের পাঁচ একর জমির ফসল এভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। করোনা মহামারির এই সময়ে বন বিভাগের এমন ‘অমানবিক আচরণে’ তারা এখন পথে বসার উপক্রম। গারোরা জানান, যুগ যুগ ধরে দখলসত্ত্বেও এই জমিতে চাষ করে আসছেন তারা। কেউ উত্তরাধিকার, আবার কেউ ‘বাংলা দলিল’ (রেজিস্ট্রিবিহীন) মূলে এই জমির মালিক।

অবশ্য বন বিভাগের বক্তব্য, সিএস ১০৪ দাগের বনভূমির জবরদখল হওয়া জায়গা তারা উদ্ধার করছে। এই ধারাবাহিকতায় গতকাল সকালে শোলাকুড়ি ইউনিয়নের পেগামারীতে বাসন্তী রেমার কলাবাগানটি কেটে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। গেতিস জেত্রার স্ত্রী বাসন্তী রেমা জানান, তার পূর্বপুরুষ এক শতাব্দী ধরে এ জমি চাষ করে আসছে। উত্তরাধিকার সূত্রে ভোগদখলকারী হিসেবে দেড় বিঘা জমিতে ঋণ করে তিনি পাঁচশ’ শবরি কলার চারা রোপণ করেছেন।

সদ্য সমাপ্ত বনরক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কর্মী বাহিনীর সদস্য (সিএফডব্লিউ) হিসেবে তিনি বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। কিন্তু বন বিভাগ দখলমুক্ত করার নামে হঠাৎ তার বাগানের কলাগাছ কেটে সাবাড় করে ফেলেছে। আর্থিক সংকটের এ সময়ে এমন আচমকা ঘটনায় তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

স্থানীয় মান্দি (গারো) নেতা উইলিয়াম দাজেল জানান, বিনা নোটিশে বন বিভাগের এমন ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ দুঃখজনক। বন বিভাগের সঙ্গে কাজ করা লোকজন যদি এমন অবস্থার শিকার হন, তবে বন রক্ষায় বন বিভাগের পাশে কেউ থাকতে চাইবে না।

এদিকে, কলাবাগান কাটার খবরে স্থানীয় গারোরা বন বিভাগের কর্মীদের ধাওয়া দেন। ধাওয়া খেয়ে তারা দোখলা রেঞ্জ কার্যালয়ের কাছে ডাকবাংলোতে আশ্রয় নেন। সেখানে রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুল আহাদসহ একাধিক কর্মকর্তা অবস্থান করছিলেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ গারোরা সেখানে গিয়ে ফসল কাটার প্রতিবাদে কার্যালয় অবরোধসহ বিক্ষোভ করেন। তারা নানা স্লোগান দিয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তার পদত্যাগ দাবি করেন।

রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুল আহাদ বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা তাদের এক শ্রমিককে মারধর করেছে। তার বাসাসহ গার্ড রফিকের বাসায় ভাঙচুর চালিয়েছে। রেঞ্জ কার্যালয়ের মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেছে।

পরে পুলিশ এসে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করে। সহকারী বন সংরক্ষক জামাল উদ্দিন তালুকদারও ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরে গারো নেতাদের মধ্যস্থতায় বুধবার (আগামীকাল) বিষয়টি নিয়ে মীমাংসা বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়। এমন প্রতিশ্রুতি পেয়ে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে নেন।

সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. জামাল উদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘বন বিভাগের নিয়মিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে জবরদখল হওয়া বনভূমি দখলমুক্ত করার কাজ চলছে। দখলমুক্ত করতে গিয়ে আজ এমন ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। ডিএফওর উপস্থিতিতে গারোদের পরিস্থিতির কথা জানানোর দাবিতে বুধবারের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে পরিস্থিতি এখন অনেকটা স্বাভাবিক। মীমাংসা অনেকটাই হয়ে গেছে।’

স্থানীয় কৃষক সুরুজ আলী বলেন, ‘এই জমির পাশে বন বিভাগের ২০০৭-০৮ সালের দিকে আগর চাষের প্রকল্প ছিল। ওই প্রকল্পের বাইরে থাকা আমাদের এ জমিতে তখনও ফসল ছিল। তখন আগর চাষ ব্যর্থ হয়। আগের ব্যর্থ প্রকল্পের জমির সঙ্গে আমাদের জমি দেখিয়ে বন বিভাগ এখন নতুন করে কাজুবাদাম চাষের প্রকল্প নিয়েছে। এ কারণে আমাদের ক্ষতি করছে তারা।’

error: Content is protected !!