টাঙ্গাইলে প্রেমের ফাঁদে ফেলে একাধিক বিয়ে ও  প্রতারনা : তথ্য গোপন করে সরকারি চাকরি

টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার শাহনাজ পারভীন রূপা ওরফে রিপা (২৩) একাধিক বিয়ে হলেও নিজেকে কুমারী দাবি করে বিত্তবান পরিবারের যুবকদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেয়া ও তথ্য গোপন করে সরকারি চাকরি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মিজানুর রহমান নামের এক যুবক রুপাসহ তিন জনের নামে আদালতে মামলা দায়ের করেছে।

আসামীরা হলেন, ধনবাড়ী উপজেলার মমিনপুর গ্রামের ইদ্রিস আলী মন্ডলের মেয়ে শাহনাজ পারভীন রূপা ওরফে রিপা (২৩), রুপার বোন সিমা আক্তার (১৯), রুপার মাতা শিউলি বেগম।

মামলার বিবরণ ও এলাকাবাসী সুত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার এনায়েতপুর এলাকার মিজানুর রহমান ২০১৩ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য মালেয়শিয়া যায়। সেখান থেকে শাহনাজ পারভীন রূপা ওরফে রিপার সাথে ফেসবুকে পরিচয় হলে এক সময় তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। মিজানুর রহমান ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ফিরে আসলে তাদের দেখা সাক্ষাত হয়। টাঙ্গাইলের কুমুদিনী কলেজে পড়াশোনা অবস্থায় ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত টিউশন, কলেজের বেতন ও হোস্টেল খরচ হিসেবে দেড় লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয় রূপা।

পরবর্তীতে তাদের মধ্যে বিয়ে ঠিক হলে সরকারি চাকরির জন্য মিজানুরের কাছ থেকে আরও আড়াই লাখ টাকা নেয় রূপা। এরপর শাহনাজ পারভীন রূপা ধনবাড়ী উপজেলার যদুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে নিয়োগ পায়। এরপর মিজানুর রহমান রুপাকে বিয়ের কথা বললে তিনি বিয়ে করবে না বলে অস্বীকার করেন। পরে মিজানুর রহমান ও তার পরিবার টাকা ফেরত চাইতে রুপার বাড়িতে গেলে মিজানুরের মাকে এলপাথারী ভাবে মারধর করে তাদের তাড়িয়ে দেয় এবং টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন রুপা।

রুপার এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে পার্শ্ববর্তী মধুপুর উপজেলার আমবাড়ীয়া গ্রামের হায়দার আলীর ছেলে রোকনুজ্জামানের সাথে পারিবারিক ভাবে রুপার বিয়ে হয়। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় পরকীয়া প্রেমে পালিয়ে গিয়ে রোকনুজ্জামানের বন্ধু একই উপজেলার মোল্লাবাড়ী এলাকার মৃত হাজী শহীদ আলীর ছেলে মনির হোসেনের সাথে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এরপর আগের দুটি বিয়ের তথ্য গোপন করে তৃতীয় বিয়ে করেন নড়াইল জেলার লোহাগড়া থানার ইতনা গ্রামের মৃত জালাল বিশ্বাসের ছেলে বি এম সোহেল রানাকে। তাদের বিয়ের কয়েকমাস যেতে না যেতে একই এলাকার আলতাফ শেখের ছেলে মজুরুল শেখের সাথে অনৈতিক অবস্থায় ধরা পড়লে এলাকার মাতাব্বর জলিল মুন্সি, ইউসুফ শেখ, কামরুল শেখ, হাবিব হানদার ও বাদশা হানদার সহ এলাকাবাসী সালিশি বৈঠক করে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে।

আরো জানা যায়, শাহনাজ পারভীন রূপার শিক্ষাগত সনদপত্র ও সরকারি চাকুরিতে আবেদন এবং কাবিননামায় যে তথ্য দিয়েছে তার একটির সাথে আরেকটির মিল নেই। রুপার প্রথম বিয়ে হয় ২০১২ সালে রোকনুজ্জামান ও ২০১৪ সালে মনির হোসেনের সাথে। দুটি কাবিন নামায় রুপার মাতার জাতীয় পরিচয় পত্র শিউলি বেগম (৯৩২১২০৪৩৫৭৪০), স্বামী ইদ্রিস আলী মন্ডল, মাতা কুলসুম বেগম। পিতা ইদ্রিস আলী মন্ডল (৯৩২১২০৪৩৫৭৩৫), পিতা চান মিয়া মন্ডল, মাতা ছাহেরা বেগম রয়েছে। তার এসএসসি এইচএসসি সনদ পত্রে একই নাম থাকলেও বর্তমানে দেখা গেছে পিতা শামছ উদ্দিন ও মাতা হেলেনা খাতুন। কাবিন নামা ও শিক্ষাগত সনদপত্রে এবং জাতীয় পরিচয় পত্রে পিতা মাতার নাম ভিন্ন রকম রয়েছে।

২০১৯ সালের আগস্ট মাসে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এ রুপা চাকুরির জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। সেখানে নিজেকে অবিবাহিত উল্লেখ করে স্থানীয় ও বর্তমান ঠিকানার যায়গায় পিতার নাম শামছু উদ্দিন, মাতা হেলেনা খাতুন, গ্রাম দাত্তাপাকুটিয়া, উপজেলা ফুলবাড়িয়া, জেলা ময়মনসিংহ আবেদন করে সে।

২০১৮ ও ২০১৯ সালে পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরে নিজেকে অবিবাহিত এবং পিতা মাতার নাম শামছু উদ্দিন, মাতা হেলেনা খাতুন, গ্রাম মমিনপুর, উপজেলা ধনবাড়ী উল্লেখ করে আবেদন করেন শাহনাজ পারভীন রূপা।

একটি সূত্র জানায়, ধনবাড়ী উপজেলার যদুনাথপুর ইউপি সদস্যকে ম্যানেজ করে ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার দাত্তাপাকুটিয়া গ্রামের মামা শামছু উদ্দিন, মামি হেলেনা খাতুনকে পিতা মাতা সাজিয়ে ধনবাড়ী উপজেলার মমিনপুর গ্রামের স্থানীয় ও বর্তমান ঠিকানা উল্লেখ করে জন্ম সনদ ও নাগরিকত্ব সনদ হাসিল করেন রুপা।

২০১৯ সালে ধনবাড়ী উপজেলার যদুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে যে নিয়োগ নিয়েছে শাহানাজ পারভিন। সেখানে তিনি অবিবাহিত ও পিতা ইদ্রিস আলী মন্ডল এবং মাতা শিউলি বেগমের নাম গোপন করে তার মামা মামির নাম দিয়ে কিভাবে চাকরি পেলেন, সেটি এখন একটি বড় প্রশ্ন? যা চাকরিবিধি অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। এমন অপরাধের ক্ষেত্রে তথ্য গোপনকারীকে চাকরিচ্যুত করার বিধান রয়েছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত শাহনাজ পারভীন রূপা মুঠোফোনে বিয়ের কথা স্বীকার করে জানায় শামস উদ্দিন ও হেলেনা খাতুন তার মামা মামি। তবে বাকি অভিযোগ নিয়ে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি কোন মন্তব্য না করে প্রতিবেদনের প্রতিবেদকের ফোন কেটে দেয়। পরে বারবার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেনি।

প্রতারণার স্বীকার ও মামলার বাদী মিজানুর রহমান বলেন, আমার সাথে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সেই টাকা ফেরত চাইতে গেলে আমার মাকে তারা মারধর করেন। আমি এই নারীর সর্বচ্চো শাস্তি দাবী করছি। আর যেন কোন পুরুষ এই নারীর প্রতারণার স্বীকার না হয়।

যদুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মীর ফিরোজ আহমেদ সনদপত্র দেয়ার কথা স্বীকার করে জানায়, একটা ইউনিয়নের সবাইকে আমি চিনি না। যে যখন আসে তাকেই সনদপত্র দিতে হয়।

টাঙ্গাইল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর উপ পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদ জানায়, মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

ধনবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা সিদ্দিকা জানায়, বিষয়টি মাত্র শুনলাম। যদি এরকম ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হব।

error: Content is protected !!