শেখ কামাল কেমন ছিলেন— বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

কদিন থেকেই যুবলীগ শেখ কামালকে নিয়ে আলোচনা করছে। শেখ কামাল যুবক ছিল, কখনো যুবলীগ করেনি। যুবলীগের জন্ম দিয়েছিলাম আমরা। জনাব শেখ ফজলুল হক মণি সভাপতি, আমরা কয়েকজন ছিলাম প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডিয়াম সদস্য। সেই যুবলীগ শেখ কামালকে নিয়ে আলোচনা করায় আনন্দিত হয়েছি। শেখ কামালও আর দশজন বাঙালির মতো ছিল। তার হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা সবই ছিল আমাদের মতো। কত আর হবে আমার থেকে দুই-আড়াই বছরের ছোট। ’৭২-এর ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু যখন আমার হাত থেকে অস্ত্র নিতে টাঙ্গাইল গিয়েছিলেন সেখানে জামাল-রাসেল ছিল, কামাল ছিল না। ১৮ ডিসেম্বর ’৭১ পল্টনে প্রথম জনসভায় শেখ জামালকে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা ছিলাম বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে লতায়-পাতায়, ছায়ায়-মায়ায় জড়িত। রাজনৈতিক নানা টানাপোড়েন চললেও মানবিক দিক থেকে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আমার ছোট বোন রহিমা ’৬০-৬১ সালে পূর্বদেশে শিশু বিভাগ সম্পাদনা করতে ঢাকা এলে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী তাকে ধানমন্ডির ৩২-এর বাড়িতে রেখেছিলেন। এক-দুই দিন তিনি না যাওয়ায় ক্লাস এইট-নাইনে পড়া রহিমা খুবই চিন্তিত হলে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা রহিমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি জানো না লতিফ আর আসবে না। ও তো তোমাকে বিক্রি করে গেছে। ’ এ কথা শুনে রহিমার সে কী কান্না। তখন তিনি রহিমার মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক আদর করে বলেছিলেন, ‘তুমি কেঁদো না। তোমার কাজ তুমি কর। বিক্রি করে দিলে কী হবে, আমরা তোমাকে দিয়ে কোনো কাজ করাব না। তুমি লেখাপড়া কর। আমরা তোমাকে খুব আদর করব, ভালো স্কুলে পড়াব। ’ রহিমা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ‘আমার মার জন্য যে মন পোড়ে। ’ ‘ঠিক আছে, তোমার যদি মায়ের জন্য অতই মন পোড়ে তোমার মাকে খবর দেব। তিনি এসে দেখে যাবেন। ’ ধানমন্ডি নিয়ে কত স্মৃতি, কত স্মৃতি দুই পরিবারের। কামালকে কখন প্রথম দেখেছি বলতে পারব না। তবে কামাল আলোচনায় আসে ঢাকা কলেজের ছাত্র হিসেবে। আগরতলা মামলার আগে থেকেই সে ছিল একজন নিবেদিত ছাত্রলীগ কর্মী। এখনকার মতো ছাত্রলীগ কর্মী ভাবলে কামালকে অসম্মান করা হবে। আমরা যেমন নিরলস নিখাদ কর্মী ছিলাম, কামালও ছিল সেই রকম। সে সময় ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল জলিল সাহেবের জন্য কেউ মিছিল করতে পারত না। একমাত্র কামালই শিরদাঁড়া সোজা করে প্রিন্সিপালের সামনে দিয়ে মিছিল বের করে আনত। এরপর ’৬৯-এর গণআন্দোলনে ঢাকা কলেজের ভূমিকা সে তো সূর্যের কাছাকাছি লটকে রাখার মতো গৌরবের। কত বড় বড় নেতা ঢাকা কলেজ থেকে বেরিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রেখেছে, স্বাধীনতার পরও তাদের ভূমিকা অসাধারণ।
কামাল ছিল খুবই বিনয়ী, সংস্কৃতিমনা, অন্যের প্রতি নিবেদিত। এক ক্রীড়াবিদ এবং ক্রীড়া সংগঠক। কিন্তু এসবের কোনো মূল্যই সে পায়নি, শুধু দুর্নামই পেয়েছে। বোধহয় এমনই হয়। অনেক সময় ত্যাগী সৎ মানুষ অযথা নিন্দার শিকার হয়। আজকাল কত নেতার কত সন্তানের কত ক্ষমতা। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে হয়েও শেখ কামালের তেমন কোনো ক্ষমতা ছিল না। কোনো অফিসে যায়নি, ফোন করেনি। এর পরও কত বদনাম। আবাহনী ক্লাব করে বদনামের ভাগী হয়েছিল। যখন যে কাজ করতে গেছে সেখানেই সুপরিকল্পিতভাবে তার নামে বদনাম করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগ আনা হয়েছিল তার নামে। কী তাজ্জব ব্যাপার! এ পর্যন্ত সাধারণ ব্যাংকের ভল্ট ভেঙে কেউ টাকা নিয়েছে তেমনটাও খুব একটা শোনা যায় না আর বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট ভেঙে টাকা নেওয়া সে কি চাট্টিখানি কথা! এখনো কাউকে সাত দিনের সময় দিয়ে ছেড়ে দিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট ভেঙে একটা ছিদ্রি পয়সাও নিতে পারবে না। পাঠক! ছিদ্রি পয়সা চিনবেন কিনা জানি না। আগেকার দিনে তামার ছিদ্রি পয়সা ছিল। মানে মাঝখানে গোল ফুটো। আজকাল ইংরেজির এত প্রচার-প্রসার। বাচ্চারা এখন বাংলা বলে না, তাদের মুখ দিয়ে ইংরেজির খই ফোটে। এর পরও আমরা বুঝি না, ও, Major Zia, do hereby declare the independence of Bangladesh on behalf of our great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman! এতে কী করে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক হন। সবকিছু যে বঙ্গবন্ধুর জন্য বা তার নামে হয়েছে এটা বুঝতে চায় না। ঠিক তেমনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট ভাঙার কোনো উপায় ছিল না। তা সবাই জানে। কিন্তু বদনাম করার জন্য, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য ওইভাবে কামালকে নিন্দিত করা হয়েছে।
স্বাধীনতার পর এখনকার মতো ছিলাম না। তখন লোকজন চিনত। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তাই অস্তিত্ব ছিল। নেতানেত্রী-মন্ত্রীদের কিছু বললে তারা শুনতেন। একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার ছয়-সাত জন ছাত্র এসেছিল। তাদের বৃত্তি চাই। বড় মুখ করে গিয়েছিলাম তখনকার শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলীর কাছে। তিনি বলেছিলেন, ‘ভায়া! আমাদের আর কিছু করার নেই। সব কোটা শেষ হয়ে গেছে। এখন যা করার তোমার নেতা করতে পারেন। ’ সেখান থেকেই গিয়েছিলাম গণভবনে। ঘটনা খুলে বললে অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে ডেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বছর ঘোরেনি, আমার এক কথায় কাদের অস্ত্র দিয়ে দিয়েছে। ও বিদেশিদের জন্য কয়েকটা স্কলারশিপ চেয়েছে। এটা না করা যায়? আল্লাহ নারাজ হবেন না? ওর কোনো কথা না করবেন না। দরকার হলে কোটা বাড়িয়ে বৃত্তি দিয়ে দিন। ’ বুকটা আনন্দে ভরে গিয়েছিল। সেদিনের সেই মর্যাদার কথা ভুলতে পারি না। তাই এখনো এর-ওর কাছে এটা-ওটা নিয়ে যাই। কেউ কেউ সে রকমই করে, আবার কেউ অবহেলাও করে।
শেখ কামাল হঠাৎ একদিন বাবর রোডে হাজির, ‘ভাই! একটা কাজ করে দিতে হবে। ’ কী কাজ? ‘না, তেমন কিছু না। আপনি ছাড়া হবে না। তাই আপনার কাছে এলাম। ’ কী বিপদ! বঙ্গবন্ধু ভাই, শেখ কামালও ভাই। যদিও পরে সম্পর্কের দ্বন্দ্ব অনেকটাই দূর হয়ে গিয়েছিল। ’৭৩-৭৪ এর পরে কখনো বঙ্গবন্ধুকে ভাই বলে ডাকিনি, চিন্তাও করিনি, প্রয়োজনও পড়েনি। স্বাধীনতার পর কামালকে প্রথম পেয়েছিলাম কলকাতার বসুশ্রী সিনেমা হলে। ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতি গড়ের মাঠে বিজয় মেলার আয়োজন করেছিল। সেখানে ঢাকা থেকে আবদুল কদ্দুস মাখন, আ স ম আবদুর রব, শিল্পী আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ আরও অনেকেই গিয়েছিলেন। সে দলে কামালও ছিল। আমরা মেঘালয়, আসাম ঘুরে কলকাতা গিয়েছিলাম। উপমহাদেশের বিখ্যাত মরমি পল্লীগীতি গায়ক আবদুল আলীম ছিলেন আমার সঙ্গে। গীতিকার-সুরকার লোকমান হোসেন ফকির, উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী গোলাম ফারুক আরও অনেকে। বসুশ্রী হলে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়, যুবনেতা প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সী, সুব্রত মুখার্জি, সোমেন মিত্র, সৌগত রায়সহ আরও অনেকে।
শেখ কামাল যখন বলছিল, ‘শুধু আপনার পক্ষেই সম্ভব। ’ আমি অবাক হয়েছিলাম শুধু প্রধানমন্ত্রীই নয়, জাতির পিতার বড় ছেলের কোনো কাজের জন্য আমার কাছে আসা। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কী কাজ? ‘সোহরাব আঙ্কেলকে বলে দিতে হবে। ’ সোহরাব আঙ্কেল তখন পূর্ত ও ত্রাণমন্ত্রী। কী বলতে হবে? ‘না, তেমন কিছু না। মোহাম্মদপুরের পরিত্যক্ত ছোট্ট একটা প্রেস তার পরিচিত একজনকে বরাদ্দ দিতে হবে। ’ পরে জানলাম, ৩০ হাজার টাকায় আমার সুপারিশে পাঁচ-ছয় দিন আগে সেই প্রেস একজনকে বরাদ্দ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার সুপারিশে দেওয়া হয়েছে বলে কামাল বলার পরও সোহরাব ভাই এগোতে চাননি। মাগুরার সোহরাব হোসেন বড় ভালো মানুষ ছিলেন। মাগুরা বলতে সোহরাব ভাই আর আসাদ ভাই। এখন ভাইয়েরা নেই, এখন সব ভাতিজার কারবার। তারা কেউ চেনে, কেউ চেনে না। কামাল কিছু বললে না করা যায়? আর না করার কোনো দরকারও ছিল না। পরদিন গিয়েছিলাম সোহরাব ভাইয়ের অফিসে। কাগজ তৈরিই ছিল শুধু আমার সম্মতি। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বরাদ্দের কাগজ কামালের হাতে দিয়েছিলেন। ওই সময় বর্তমানের মস্ত ধনী সালমান এফ রহমানকে কামালের সঙ্গে সব সময় দেখতাম। আমার বাড়িতেও কয়েকবার এসেছেন। কী বিচিত্র ব্যাপার! সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে সব কেমন বদলে যায়।
আমার ছোট্ট বোন শুশু ইডেনে পড়ত। মাঝে মাঝেই কলেজ থেকে ফিরে মাকে বলত, ‘মা! শেখ কামালকে দেখলাম। কিন্তু আগে সালাম দিতে পারলাম না। ’ এ কথা অনেকবার অনেকের কাছে শুনেছি। কামালকে অনেকেই সালাম দিতে পারেনি। সে সব সময় আগে সালাম দিত। এটা তার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। এত বিনয়ী একটা মানুষ কিনা নিন্দা নিয়ে এ পৃথিবী ত্যাগ করেছে। ১৫ আগস্ট তাকে যারা হত্যা করেছে তারা বড় নির্মমভাবে তার ওপর গুলি চালিয়েছে। বেহালায় সুর ফুটানো ছিল যার স্বভাব সে কেন এমন বেসুরা চলে গেল— আজও তার উত্তর খুঁজে পাই না।

(হাবিবুন নবী সোহেল,পুরোনো ফাইল)

error: Content is protected !!