কৃষকের ঈদ আনন্দ ভেসে গেছে বানের পানিতে

করোনা ও বানের পানিতে ঈদের আনন্দ ভেসে গেছে কৃষকের। একের পর এক দুর্যোগে নিঃস্ব হয়েছেন দেশের অনেক কৃষক। ঈদের দিন ভালো খাওয়া তো দূরের কথা অনেকের ভাগ্যে খাবার জুটবে কি না তা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথমে করোনা, এরপর সুপার সাইক্লোন আমফান, কালবৈশাখী, অতিবৃষ্টি ও সর্বশেষ বন্যার কবলে পড়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। এতে অনেক কৃষকের আউশ ধান, আমনের বীজতলা এবং সবজি ক্ষেত বানের পানিতে ভেসে গেছে। অনেকের বাড়িঘরে পানি উঠেছে। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল নিয়েও অনেকে বিপদে আছেন।বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার উল্লাপাড়া গ্রামের কৃষক হেলাল খাঁর সঙ্গে কথা হয়। ঈদের কথা জিজ্ঞেস করতেই জাগো নিউজকে তিনি বলেন, আমাদের কি ঈদ আছে? ধার কর্জ করে, সার বাকি নিয়ে ৬ বিঘা জমিতে আউশ ধান আবাদ করেছিলাম। চোখের সামনে আমার ৬ বিঘা জমির আউশ ধান ডুবে গেলো আর আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। আর এক সপ্তাহ পরেই ধানগুলোর শীষ বের হতো। বোরো ধান কাটার পরপরই জমি চাষ দিয়ে এই আউশ ধান করা হয়েছে। ৬ বিঘা জমিতে কমপক্ষে ১২০ মণ ধান পেতাম। যার দাম ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। তারপর কি আর ঈদ থাকে?
এই হাহাকার শুধু হেলাল খাঁর নয়। এটা পুরো বাংলাদেশের কৃষক পরিবারের চিত্র।
গোবিন্দগঞ্জের সাংবাদিক রুবেল এলাকার কৃষক পরিবারগুলোর চিত্র তুলে ধরে বলেন, করোনার সময় কৃষক ফসল, সবজি বিক্রি করতে পারেনি। বাজারে সবজি নিয়ে ফেলে দিতে হয়েছে। সেই থেকে নানা দুর্যোগ কৃষকের ওপর। এখন বানের পানিতে ভাসছে পুরো উত্তরাঞ্চল। তিনি বলেন, কৃষক পরিবারগুলোর যে কি দুরাবস্থা তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। দিনভর বৃষ্টির কারণে অনেকে চুলা জ্বালাতে পারছে না। এমন অবস্থায় ঈদ তাদের কাছে বিষাদময়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উজানের ঢল এবং অতি বৃষ্টিতে গত জুনমাস থেকে সৃষ্ট বন্যায় উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এবার শুধু নিম্নাঞ্চল নয়, উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ জেলাসহ জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ ফরিদপুর, মাদারীপুরসহ ২১টি জেলায় বন্যা হচ্ছে। এর ফলে এসব অঞ্চলে আউশ ধানসহ, পাট, সবজি, বাদাম ইত্যাদি ফসল ডুবে গেছে। এসব এলাকার কৃষক পরিবারগুলোরও একই দশা।
এলাকার কৃষকরা বলছেন, করোনার কিছু কিছু ত্রাণ পাওয়া গেলেও বন্যার সময় কোনো ত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না। এমপি-মন্ত্রীরাও এলাকায় যাচ্ছেন না।
গত ২০ জুলাই কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, বন্যায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৪৯ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। তিনি বলেন, বন্যায় আউশ, আমন, সবজি, পাটসহ বেশ কিছু ফসলের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষতি কমিয়ে আনতে কৃষকের জন্য অনেকগুলো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিকল্প বীজতলা তৈরি, ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে বিকল্প ফসলের চাষের ব্যবস্থা, নিয়মিতভাবে আবহাওয়া মনিটরিংসহ প্রস্তুতি চলছে যাতে করে বন্যার কারণে ফসলের ক্ষতি মোকাবিলা করা যায়।
জানা গেছে, কুড়িগ্রামে বন্যায় কৃষি ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে ৫ হাজার ৬৫৩ হেক্টর। এরমধ্যে আমন বীজতলা ৪৩৫ হেক্টর, আউশ ৮২৫ হেক্টর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান প্রধান জাগো নিউজকে বলেন, বন্যায় ১ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে।
গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, বন্যার পানিতে জেলায় ১৯৬ হেক্টর আউশ ধান পানিতে ডুবে গেছে।
সিরাজগঞ্জ জেলার জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জে ৫৫ হেক্টর আউশ ধান নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমির অন্যান্য ফসলও তলিয়ে গেছে।
জামালপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আমিনুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, জেলায় বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ২৮৬ হেক্টর জমির আউশ ধান। এ ছাড়া ৬৫ হেক্টর আমনের বীজতলা ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে।

error: Content is protected !!